আমি কিছু লেখা লেখার জন্য বেঁচে আছি
November 10, 2025
আমি কিছু লেখা লেখার জন্য বেঁচে আছি...
আমি কিছু বই পড়ার জন্য বেঁচে আছি।
আমি কিছু জায়গা ঘুরে দেখার জন্য বেঁচে আছি।
আমি কেন বেঁচে আছি, তা ভাবলে যে কারণগুলি চোখের সামনে চলে আসে, তার প্রত্যেকটিই ব্যক্তিগত। বেঁচে যে আছি, তা মূলত একটি অভ্যস্ততা। সে অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসা যায় না, এমন নয়। তবে বেরিয়ে আসার কথা ভাবলে ওপরের কয়েকটি বিষয় মাথায় এসে যায়। আমি এটা ভেবে দেখেছি অসংখ্যবার। আমার ওরকমই মনে হয়। হয়তো ওসবের কানাকড়িও দাম নেই, কিন্তু আমার কাছে ওসবই বেঁচেথাকার রসদ, তাই অমূল্য!
একসময় বাঁচতাম পরিবারকে সুখী করার জন্য। কাজটা করতে পারার পর দেখি, বাঁচাটা আগের চাইতে আরও কঠিন হয়ে গেছে! আপনি যাদের সুখী করতে বেঁচে আছেন, তারাই আপনাকে সবচাইতে বেশি কষ্ট দেবে। তাই, কারও জন্য বেঁচে থাকা যায়, আমি এটাতে এখন আর বিশ্বাস করি না। আমি মরে গেলে সত্যিই কি কারও তেমন কিছু এসে যায়? আমার যা দেয়ার ছিল, তা তো দিয়েই দিয়েছি! এখন আমার আয়ু তো সবার জন্যই অপ্রয়োজনীয় ও বাড়তি! কারও মৃত্যুতে অন্যদের কী এসে যায় কী এসে যায় না, তা নিয়ে নাজিম হিকমতের চাইতে সত্যবদ্ধ উচ্চারণ আর কেউ কখনও করেননি---বিংশ শতাব্দীতে, মানুষের শোকের আয়ু বড়োজোর এক বছর।
আমি মরে গেলে পরিবারের সবাই আর কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী হয়তো কাঁদবে, মন খারাপ করবে। এরপর আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। এ পৃথিবীর নিয়ম হল, এখানে সব ঠিক হয়ে যায়। এখানে কান্না আমৃত্যু চলমান কোনও প্রক্রিয়া নয়। এখানে যে যার মতো করে বেঁচে থাকে। আরেকজন কীভাবে বেঁচে আছে, তার কীভাবে বেঁচে থাকতে ভাল লাগে, এসব নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? মানুষ খুব সহজেই ছবি হয়ে যায়। ছবি হয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এটা বোঝা যায় না। বোঝা গেলে মানুষকে নিজের পরিবারেই অতো কষ্ট পেয়ে বাঁচতে হতো না। আমার কাছের এক বন্ধু তার বাবার সাথে অনেক দুর্ব্যবহার করে ফোনটা রাখার মিনিট সাতেকের মধ্যেই তার বাবা স্ট্রোক করে মারা যান। বন্ধুটি বাবার কবরে ফুল দিতে যায়। কেন যায়, আমি বুঝতে পারি না।
এই যে এত কষ্ট করে সবকিছু সহ্য করে বেঁচে আছি, শতভাগ সততা নিয়ে বলছি, ওই ব্যক্তিগত লোভগুলি না থাকলে আত্মহত্যা করতে আমারে দুই মিনিটও সময় লাগত না। আমার পরিবার কিংবা আমার সন্তানের জন্য আমি অপরিহার্য নই। মরে গেলে সন্তানের হাসিটা আর দেখতে পাব না, এটা ভেবে অনেক মন খারাপ হয়, কিন্তু পর মুহূর্তেই মনে হয়, সন্তানকে আমি যতোই ভালোবাসি না কেন, সেও একসময় অকৃতজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে, মনে দুঃখ দিতে পারে। তাছাড়া আমার মৃত্যুর সাথেই তো আমার সকল অনুভূতিরও মৃত্যু হবে। তার চেয়ে ভাল, আমার যা কিছু সঞ্চয়, সবার জন্য তা কিছু রেখে হাসিমুখে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া! প্রায় ভাবিও এমন করে!
আবার সেই পিছুটান! এখন বুঝি, কিছু পিছুটানই আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে। পিছুটান ব্যাপারটা না থাকলে প্রতিদিন খবরের কাগজে চোখ রাখলেই আমরা অসংখ্য আত্মহত্যার খবর দেখতে পেতাম।
মানুষ দুঃখ পেয়ে ও দুঃখ দিয়ে বাঁচে। হতে পারে, যে দুঃখটা দিচ্ছে, সে ইচ্ছে করে দিচ্ছে না। কিন্তু দুঃখটা যে পাচ্ছে, সে তো পাচ্ছেই! চুপচাপ কষ্ট গিলে ফেলতে অনেক বেশিই কষ্ট হয়! পরিবারের সবচাইতে নিঃস্বার্থ মানুষটিই পরিবারের কাছ থেকে সবচাইতে বেশি দুঃখ পায়। সে চুপ করে থাকে বলে কেউ কখনও বুঝতেই পারে না, বেঁচে থাকতে তার কতটা কষ্ট হচ্ছে! বইয়েটইয়ে লেখা থাকে, ঘর পৃথিবীর সবচাইতে স্বস্তির জায়গা।.......ভীষণ বাজে কথা ওটা!
ভাবি, সব ছেড়েছুঁড়ে দূরে কোথাও চলে যাই, যেখানে কেউই আমাকে চেনে না, যেখানে গেলে নতুন করে জীবন শুরু করা যাবে। এটা স্বার্থপরতা নয়, এটা বাঁচতে চাওয়া। যে ঘরে সবাই জিততে চায়, সে ঘরে বাঁচা খুব কঠিন। ঘর কোনোভাবেই ক্ষুধা ও কাম নিবৃত্ত করার অপরিহার্য জায়গা নয়। ঘর হল এমন একটা জায়গা, যেখানে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা একে অপরের জন্য হারতে জানে, ইগোকে দূরে সরিয়ে কাছে টানতে জানে। যেখানে কথা বলার আগে একশোবার ভাবতে হয়, ভয় পেতে হয়, পাপবোধে ভুগতে হয়, সেটা আর যা-ই হোক, ঘর কিছুতেই না।
আমাকে বুঝতে হলে আমার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করে থেকো না, বেঁচে থাকতেই আমাকে বোঝার চেষ্টা করো। আমি মরে গেলে আমার সম্পর্কে অনেক ভালভাল কথা বলেই-বা কী হবে? আমার আর্তনাদ শুনতে পাও না বলে আমি ব্যথা পাচ্ছি না, এমন তো নয়! আমি এখনও মরে যাইনি বলেই আমার মৃত্যুটা দেখতে পাচ্ছ না। বেঁচেথাকার বড়ো ট্রাজেডি হল, যে ঘরে কেউই আমায় বুঝতে পারে না, সে ঘরেও ফিরতে হয়! আমরা বাড়িতে ফেরার সময় ভাবি, ঘরে ফিরছি! আমরা বাড়িকে ঘর ভেবে ভুল করি। আদরের ছোটো শিশুটা আধোআধো বোলে 'বাবা বাবা' ডাকে, আর কিছু নয়, কেবলই তা শোনার মোহে ঘরে ফেরে কত মানুষ, সে খোঁজ কে রাখে!
ভয় থেকেই হোক আর বাঁচতে চাওয়ার কারণেই হোক, আমরা মরে যেতে পারছি না বলেই পরিবার আমাদের দুর্বলতার সুযোগটা নেয়। আত্মহত্যা করতে পারছে না যে, তাকে কষ্ট দিয়ে কথাবলা সহজ, তার বেলায়, আর কখনও আঘাত না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা ভেঙেফেলা সহজ! আছে এমন কিছু গভীর সংবেদনশীল মানুষ, যারা কাঁদতে জানে না, সারাজীবন কেবলই হাসিমুখে কষ্ট পেতে জানে।
Recent Posts
হাসপাতালে মানুষের অধৈর্যতা: একটি সামাজিক বাস্তবতা
Faisal Bhuiyan
November 10, 2025
মানবিক দায়বদ্ধতা এবং স্বেচ্ছাসেবা
Faisal Bhuiyan
November 10, 2025
সময় ব্যবস্থাপনা, আপনার জীবন অনেক সহজ হবে
Faisal Bhuiyan
November 10, 2025
How does time management create a great leader?
Faisal Bhuiyan
November 10, 2025
Leadership Skills | সফল ব্যক্তিত্বদের যে ৭টি গুণাবলী থাকে
Faisal Bhuiyan
November 10, 2025